Monday, April 7, 2025

তত্ত্বমসি ২ - ব্যাখ্যা

 "তত্ত্বমসি" লেখাটি আমার খুব কাছের। তাই মনে হল কবিতাটি কেন কাছের, তার একটা ব্যাখ্যা লিখি। কবিতা বা অন্য যে কোনো লেখাই একজন লিখুক না কেন, তা তার অভিজ্ঞতারই ফসল বিশেষ । জগতে বসবাসকালীন নানারকম অভিজ্ঞতা থেকে সে তার মনের কথা কলমের সাহায্যে (আজকাল ব্লগের সাহায্যে) ব্যক্ত করে। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। 

পড়াশুনা করেছি। চাকরি করছি। সাংসারিক নানা বন্ধনেও জডিয়েছি। তাই "চাই"-এর বাঁধনেও বেশ জড়িয়েছি। মনের মধ্যে মাঝে মধ্যেই প্রশ্ন এসেছে - জীবন কোন দিকে গড়াচ্ছে? আমি কি চেয়েছি আর কোন দিকে এগোচ্ছি? আমি কি আনন্দে আছি? 

কবিতার স্তবকগুলি তে আসা যাক। মনুষ্য জীবনের ষড় রিপুর প্রথমটিই হল - কাম। কাম অর্থাৎ desire। মানুষ তার সম্বিতকাল থেকেই বিভিন্ন চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে বড় হয়েছে। শিশু অবস্থায় থেকেই চকোলেট, নানারকম খেলনা, মুখরোচক খাবার, ইত্যাদিতে তার মন রঙেছে। একটু বড় হয়ে যখন স্কুলে গেল, তখন ভালো ফল করে সকলের আকর্ষণে থাকা, নানারকম ইন্ডোর-আউটডোর খেলাতেও যুক্ত থেকে জেতার বাসনায় ডুবে যাওয়া, ইত্যাদি । কলেজের সময় আবার অন্যরকম বাসনা - কাউকে মনের মত করে পাওয়ার বাসনা, নানারকম চাকরির পরীক্ষা দিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার বাসনা, ইত্যাদি । আবার চাকরি পেয়ে আরও বহুরকমের কামনার মধ্যে সে ডুবে যায়। সাংসারিক বাঁধনে  পড়লে, নিজের বাসনার সঙ্গে সঙ্গে অন্যসকলের বাসনাও পূরণ করার দায়িত্ত্ব থেকে যায়। সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে মন সর্বদাই নানারকম বাসনার প্রতি ধাওয়া করে চলেছে। এর শেষ কোথায় - সে প্রশ্নের উত্তর বোধহ্য় মানুষের জানা নেই বা জানা থাকলেও অবহেলা করাটাই সে শ্রেয় মনে করে - কারণ কামনা না থাকলে, জীবনের রসাস্বাদন থেকে বঞ্চিত থাকবে বলে সে বিশ্বাস করে। তাই মনের নানারকম চাহিদার প্রতি সে সাড়া দেয় এবং প্রতিটি চাহিদাকে সে পূরণের পথে এগিয়ে নিয়ে চলে। মনের স্বভাব তৈরী হয়ে থাকে শিশুকাল থেকেই । বাসনার পথে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে চলতে দেখে মনও বাসনা-সিক্ত  হয়ে যায়। একটির পর একটি বাসনাতে সে ডুবতে থাকে। দেখা গেছে মরণেও সেই বাসনা পিছু ছাড়ছে না। এবং এও দেখা গেছে যে এই নানাজনের নানারকম বাসনার চাপে, মানুষ অস্থির হয়ে প্রাণটা পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছে। তবে উপায় কি? এক বিখ্যাত মনীষী বলেছেন, "নির্বাসনা থাকলে এখনই (মুক্তি) হয়"। কিন্তু নির্বাসনা তো আর একদিনে আসবে না!! তবে উপায় কি? একটু একটু করে নির্বাসনা অভ্যাস করা। সেই অভ্যাস তৈরী হলে মনের মধ্যে বাসনার উদ্রেক হলেও, তা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। 

  একটি অভ্যাস হল যে মুখে বা মনে বলা "কিছু চাই না"। দিনের মধ্যে একটি সময়ে যদি এমনটা বলা যায়, তাহলে  ক্ষণিকের ঐসময়টা মুখে নির্বাসনা উচ্চারিত হওয়ায়, মনের মধ্যে নির্বাসনার বীচ বপন করা হয়। এই ভাবনা থেকে যখন নিজে সেটা অভ্যাস করছি, মনের মধ্যে ভয় প্রসূত হল - "কিছু চাই না" বলতে বলতে সত্যি যদি এমন হয় যে কিছু রইলো না? ঈশ্বরই সব মজা করে কেড়ে নিলেন - তখন? মন বিষন্ন হয়ে গেল। তাহলে বাসনা রহিত হওয়ার কোনো উপায় নেই? তখনই ঈশ্বর রক্ষাকর্তা হয়ে এলেন --- গানের চার পঙক্তি মনে পড়ল ---

"যদি দেখ পথে ভয়েরই আকার, 
প্রাণপনে দিও দোহাই রাজার, 
সে পথে রাজার প্রবল প্রতাপ, 
শমন ডরে যার শাসনে।"   

 "কিছু চাই না" এর অভ্যাসের যে নিয়ম বলা হল এবং তার থেকে যে ভয়-ভাবের প্রসব হল, সেটি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শাস্ত্রে বর্ণিত একটি শ্লোকের কথা মনে পড়লো ---- "ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎপূর্ণমুদচ্যতে, পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।" অর্থাৎ, পূর্ণ থেকে পূর্ণ যদিও যায় চলে, তবে পূর্ণই পড়ে থাকে। কি অসাধারণ!! সমস্ত ভয় থেকে রক্ষা পাওয়া গেল - ঈশ্বরই রক্ষাকর্তা - তিনিই সব করিয়ে নেবেন, ভরিয়ে দেবেন। কি অসাধারণ, তাই না! গীতার মূল সুরও তো তাই - তুমি তো কিছু নিয়ে আসনি যে তুমি নিয়ে যাবে! অতএব এই যে বাসনার উদ্রেক, তা থেকে রেহাই পেলেই জীবন-আয়নায় সঠিক চেহারা/চরিত্র ধরা পড়বে। 

মানবের জন্ম প্রেমের উৎস ধরে - শুধু মানবের কেন, সমস্ত জগতের উদ্ভব প্রেমের উৎসে --- আর আমাদের এই জীবন সেই প্রেমেরই অমর সঙ্কেত - জীবনে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গেলেও, প্রেমের প্রতি আশা, ভরসা আমাদের সেই কষ্ট লাঘব করে, এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দেয় । মরণেও তো তিনিই হাত ধরে নিয়ে যান! রবীন্দ্রনাথ কি সাধে বলেছেন, " মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান।" - ঈশ্বরই বাসনার বন্ধন, মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। আমরা ভাবি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু জন্ম জন্মান্তরের সঙ্গী থেকে ঈশ্বর আমাদের পাশে থাকছেন। কতদিন সেই জন্মজন্মান্তর? যতদিন না ঈশ্বরের সঙ্গে এক হতে পারছি - জেনো তুমিই সেই, তুমিই সেই - তত্ত্বমসি!! আনন্দম, সেথা আনন্দম!

জানি না, কবিতার ভাব ঠিকমত প্রকাশ করতে পারলাম কিনা।

সকলের জয় হোক! সকলে ভালো থাকুন।

ধন্যবাদান্তে
শুভেন্দু মাইতি
৭ই এপ্রিল ২০২৫, শিলং

 

No comments:

Post a Comment